বিপর্যস্ত বিপি অধিগ্রহণে হিসাব কষছে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বীরা

ব্যবসায়িকভাবে অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের ব্রিটিশ জায়ান্ট বিপি।

ব্যবসায়িকভাবে অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের ব্রিটিশ জায়ান্ট বিপি। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটিকে অধিগ্রহণ করে নেয়ার প্রতিযোগিতায় নামছে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলো। অধিগ্রহণ সফল হলে ১১৬ বছর ধরে রাখা স্বাতন্ত্র্য হারাবে প্রতিষ্ঠানটি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে এফটি জানিয়েছে, শেল, শেভরন, এক্সনমবিল ও টোটাল এনার্জিস ছাড়াও আবুধাবির অ্যাডনক সম্ভাব্য অধিগ্রহণের হিসাব-নিকাশ করছে।

ঋণ ও দায় বাদ দেয়া ছাড়াই বিপির অধীনে থাকা সম্পদের মূল্য ১২ হাজার কোটি পাউন্ড বা ১৫ হাজার ৮৫২ কোটি ডলারের বেশি। কিন্তু গত ১২ মাসে শেয়ারদরে ব্যাপক পতনের পর কোম্পানিটির বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭০০ কোটি পাউন্ড বা ৭ হাজার ৫৩০ কোটি ডলার।

এ বিষয়ে বিনিয়োগ সংস্থা ইলিয়ট ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে যুক্ত একজন বলেন, ‘ধারাবাহিক দুর্বল পারফরম্যান্স বিপিকে অধিগ্রহণের জন্য উন্মুক্ত করে তুলেছে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, বৃহৎ প্রতিদ্বন্দ্বীরা আগ্রহী হলেও বিপি অধিগ্রহণ এ ধরনের অন্য চুক্তি থেকে জটিল হতে পারে। কারণ বড় অংকের মুনাফার সম্ভাবনা থাকলেও এত বড় অধিগ্রহণের সঙ্গে ব্যাপক প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক নানা বিষয়ও জড়িয়ে রয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউবিএসের বিশ্লেষক জোশুয়া স্টোনের মতে, শুধু গালফ অব মেক্সিকো ও মার্কিন ব্যবসাসহ বিপির জ্বালানি তেল ও গ্যাস সম্পদের মূল্য হতে পারে ৮ হাজার ২০০ কোটি ডলার, যা কোম্পানিটির বাজারমূল্যের চেয়েও বেশি। কিন্তু কোম্পানিটি ৭ হাজার ৭০০ কোটি ডলার ঋণ ও দীর্ঘমেয়াদি দায়ে ভারাক্রান্ত।

সেক্ষেত্রে ব্রিটিশ কোম্পানি হিসেবে শেলের এ অধিগ্রহণ প্রতিযোগিতায় সম্ভাবনা বেশি। প্রতিবেদন অনুসারে, বিপি অধিগ্রহণ করতে পারলে যুক্তরাজ্যভিত্তিক শেলের কার্যক্রমে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটবে। এতে কোম্পানি প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল ও গ্যাস উৎপাদনে সক্ষম জায়ান্টে পরিণত হবে, যা এক্সনমবিল বা শেভরনের সক্ষমতার চেয়েও বেশি। সেই সঙ্গে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ শেলের দখলে থাকবে এবং মার্কিন বাজারেও তাদের হিস্যা বড় হবে।

শেলের চেয়ারম্যান অ্যান্ড্রু ম্যাকেঞ্জি দুই দশকের বেশি সময় বিপিতে কাজ করেছেন। কোম্পানি দুটি অতীতে একত্র হওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। শেলের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার সিনেড গোরম্যান সম্প্রতি বিশ্লেষকদের বলেছেন, ‘শেলের হাতে থাকা নগদ প্রবাহের পরিমাণ ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বেশি এবং বড় চুক্তির জন্য তারা ভালো অবস্থানে রয়েছে।’

শেলের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় হতে পারে বিপির গ্যাস ও এলএনজি বিভাগ। সম্প্রতি শেলের সিইও ওয়েল সাওয়ান জানিয়েছেন, এ খাতে তারা নেতৃত্বের আসন নিতে চান। তবে বিপি কিনতে চান কিনা এমন প্রশ্নে জানিয়েছিলেন, বর্তমানে শেয়ার পুনঃক্রয় তাদের বিনিয়োগকারীদের জন্য বেশি লাভজনক।

অবশ্য উভয় কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, সম্পূর্ণ একত্রীকরণ প্রক্রিয়াটি কয়েক বছর সময় নিতে পারে। এতে হাজার হাজার কর্মসংস্থান হারানো সম্ভাবনা রয়েছে, যা যুক্তরাজ্য সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল।

অন্যদিকে মার্কিন কোম্পানি এক্সনমবিল ও শেভরন ব্রিটিশ কোম্পানি কেনার সম্ভাবনা যাচাইয়ের মাঝে নিজেরাই আরেক উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অধিগ্রহণের নাটকে জড়িয়ে পড়েছে। গায়ানার স্টাব্রেয়ক ব্লকের বড় একটি জ্বালানি তেলের খনি কেনার জন্য ৫ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে হেস কোম্পানিকে অধিগ্রহণ করতে চাইছে শেভরন। এক্সন বলছে, যেহেতু তারা আগে থেকেই ওই ব্লকের এক অংশের মালিক, তাই বাকি অংশ কেনার ক্ষেত্রে তাদেরই অগ্রাধিকার থাকা উচিত।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনভেরাসের অ্যান্ড্রু গিলিক বলেন, ‘শেভরন ও এক্সনমবিল এখন হেস নিয়েই ব্যস্ত। এখন যদি শেভরনের বিপক্ষে রায় হয়, তবে তারা আয়ের নতুন সুযোগ খুঁজবে।’

হেজ ফান্ড গালো পার্টনারসের মাইকেল আলফারো বিপির উচ্চমূল্যের প্রতি নজর রেখে বলছেন, ‘ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় মার্কিন কোম্পানি দুটিই বিপির গ্যাস ও ট্রেডিং ব্যবসার জন্য বেশি অর্থ দিতে পারবে।’

এক্সনের সিইও ড্যারেন উডস সম্প্রতি জানান, তিনি সবসময় ব্যবসার সুযোগ অনুসন্ধান করেন। জ্বালানি তেলের দাম কমার কারণে কিছু কোম্পানি দুর্বল হয়েছে, সম্ভবত তিনি সে সুযোগ নিতে চান। অবশ্য হিউস্টন-ভিত্তিক এক কর্মকর্তার মতে, রাজনৈতিক বাধার কারণে ট্রান্সআটলান্টিক একীভূতকরণ কঠিন হতে পারে।’

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির (অ্যাডনকের) সঙ্গে বিপির সম্পর্ক ১৯৫৮ সাল থেকে, যখন ইউএইতে জ্বালানি তেলের সন্ধান শুরু হয়। অ্যাডনকের অনশোর ও এলএনজি ব্যবসায় অংশীদার বিপি, মিসরে তাদের একটি যৌথ উদ্যোগও রয়েছে। বিপির সাবেক সিইও বার্নার্ড লুনি এখন অ্যাডনকের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বোর্ডে রয়েছেন।

অ্যাডনকও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চায় এবং সম্প্রতি কয়েকটি মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের গ্যাস ও কেমিক্যালস চুক্তি করেছে। জ্বালানি তেল খাতের এক অভিজ্ঞ ব্যক্তি বলেন, ‘অ্যাডনক জ্বালানি তেল উত্তোলন থেকে পরিশোধন ও ট্রেডিং পর্যন্ত সব পর্যায়ে কাজ করে। তাই বিপির সঙ্গে বোঝাপড়া ভালো হবে। এছাড়া দুটি শিল্প সূত্র বলছে, যুক্তরাজ্যে বড় ধরনের বিনিয়োগ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যদি ইউএই চুক্তিতে এগোয়, তবে ব্রিটিশ সরকার ইতিবাচক মনোভাব দেখাতে পারে।

এর আগে ২০২৩ সালে ইউএই-সমর্থিত কোম্পানি টেলিগ্রাফ পত্রিকা অধিগ্রহণ চেষ্টা করলে বিতর্ক তৈরি হয়, যা দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি করে। হয়তো অ্যাডনকও আবার তেমন কিছু ঘটাতে চাইবে না। এছাড়া ২০১৫ সালে ডেভিড ক্যামেরনের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ সরকার সতর্ক করে দিয়েছিল যেকোনো বিদেশী কোম্পানি বিপি অধিগ্রহণ করলে তারা বিরোধিতা করবে। তবে সম্প্রতি সরকার ঘনিষ্ঠদের কাছে বিপি জানতে চাইছে, ক্ষমতাসীন লেবার নেতা কেয়ার স্টারমারও একই মনোভাব পোষণ করেন কিনা!

আরও